অলস মস্তিক নাকি শয়তানের বাসা । এই কথাটিকে নাকচ করে রাসেল সাহেব আস্ত একটা প্রবন্ধ লিখে ফেলেছিলেন । তাতে এই সমাজের কতটা পরিবর্তন হয়েছে আমরা জানিনা কিন্তু আমাদের মত কিছু মানুষ তাদের নিজেদের পক্ষে রাসেল সাহেবের মতন শিল্পীর কাছ কিছু অকাট্য যুক্তি পেয়ে গেছি । আমরা নিজেরা অলস নই এবং প্রবল কর্মে লিপ্ত আছি এইকথা প্রমান করবার জন্যে ঘুম থেকে উঠেই দুর্বার বেগে যে তথাকথিত কর্ম ক্ষেত্রের উদ্দেশে রওনা হই তার ফল সরূপ সমাজের যে কোনো লাভই হয় না উল্টে ক্ষতি হয় সে প্রসঙ্গেও অকাট্য যুক্তিও আমরা রাসেল সাহেবের কাছ থেকে জানতে পারি । সরকারী সংস্থানে আমাদের কর্ম নিবেদন মানে পূর্ববর্তী কিছু যুদ্ধের ঋণশোধ , পরবর্তী কিছু অপ্রয়জনীয় যুদ্ধের প্রস্তুতি আর তার সঙ্গে আমাদের গন্তব্য মসৃন করবার জন্যে কিছু ভাঙ্গা রাস্তাঘাট । আবার অন্য দিকে বেসরকারী সংস্থায় সারাজীবন কিম্বা জীবনের বড় অংশ অতিবাহিত করবার পর দেখা যায় সেই সংস্থাটি লাটে উঠেছে । সেই সংস্থার অসহায় বড় সাহেব বয়সকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে , একসময় তার সংস্থা কত বড় ছিল এবং তিনি নিজে কত কঠীন অবস্থার মধ্যে সংস্থাকে উদ্ধার করেছেন, এই গল্প করতে করতে হাসপাতাল কিম্বা কেওড়াতলার উদ্দেশ্যে রওনা হন । অতএব রাসেল সাহেব আলস্যের পক্ষে যুক্তি সাজানোর পাশাপাশি কর্ম বলতে আমরা যা বুঝে এসেছি এবং যা বুঝি তাই নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ।

যদিও কর্ম কি তা নিয়ে আমাদের ভারতবর্ষেও চর্চা কম হয়নি । এবং তার অপূর্ব অধ্যাত্যিকতা আমাদের মুগ্ধ করে । ভারত বিখ্যাত যে কথোপকথনটির মধ্যে কর্ম সম্বন্ধে আলোচনা নিয়ে আমরা সকলে চর্চা করি তার ব্যঞ্জনা এতই বিমূর্ত যে তার সুরুতেই প্রবল মারামারি, কাটাকাটির পরিবেশটিকে “ধর্ম ক্ষেত্র” বলে আখ্যা দিল । ব্যাস! তারপর আর কি ! কেউ ভাবল – ধর্ম মানেই মারামারি করা । কেউ ভাবল – শুধু ধর্ম নয় ক্ষেত্রটাও important – ক্ষেত্র বুঝেই তবেই তো ধর্ম । কেউ আবার এইসব অতিপ্রাকৃত জিনিস নাকচ করবার জন্যে লাল কালী মেখে চীনদেশে রওনা দিল ! কেউ আবার একেবারে ভগবানের মুখনিসৃত বাণী শুনে “উরিব্বাস”, বলে এমন চমকে গেল যে সে চমক আর ভাঙ্গলোই না – সারমর্ম উদ্ধার করবার চেষ্টাতেই কাটিয়ে দিল সারাজীবন। কেউ আবার কিছুই বুঝলো না, এবং না বুঝে facebook এবং whatsapp-এ মন দিল । আরো কত রকমই না হলো…

বাকি রইলাম আমরা । যারা গুরুজনদের কাছে শুনে এইটুকু বুঝলাম যে বোঝার অনেক কিছুই আছে । বিচিত্র পৃথিবীর নিরন্তর ঘটনাপ্রবাহের ঠিক বেঠিক হয় না । “আপনাকে জানা”-র সঙ্গে “তোমাকে চেনা”-র এক অদ্ভুত সম্পর্ক ঘুরপাক খাচ্ছে । মোটের ওপর এক চরম confusion নিয়ে আশ্রয় নিলাম গিয়ে সেই রাসেলীয় আলস্যে । কারণ ভানু ঠাকুরের যমুনা নদী নদী যদি “অলস” না হত, তাহলে কি সে “ললিত গীত” গাইতে গাইতে বয়ে যেতে পারতো? “চুড়ি চা–ই, চুড়ি চা–ই” হাঁকা অলস ফেরিওলা না থাকলে কি রবি ঠাকুরের “বিচিত্র সাধ” জাগত ? নাকি নিজের পান্ডিত্য গঙ্গাজলে ভাসিয়ে আলস্যের সঙ্গে মোলাকাত না হলে নাদিয়ার বিপ্লবীকে দেখা যেত? সত্যেন বোস যদি Ph.D. করবার মতন গম্ভীর ব্যস্ততায় নিজেকে জড়াতেন তাহলে কি ফোটন-কণার আজকের মতো স্বাধীন এবং এলোপাথাড়ি ছন্দ দেখা যেত ? মন্দ গতির ছন্দটি ছাড়া আষাঢ় শুধুই আসত ফসল’ফলাতে আর inflation-এর হিসাব নিকাশ করতে । তাই আমরা রইলাম আলস্যের আড়ালে কখনো বিজ্ঞান কিম্বা কখনো বা জ্ঞানের খোজে বিবিধ বিচিত্র সাধ মেটানোর আশায় আর অবান্তর কাজ নিয়ে কাল কাটাতে । সেই অবান্তর আলস্যের কিছু কথা ধরে রাখা রইলো এইখানে ।