কাল রাতে হঠাৎ ঝেঁপে বৃষ্টি নামলো। শহুরে বৃষ্টি নিয়ে কবির সুমন যতই গালমন্দ করুক না কেন বাজারের মাঝখানে এক হাতে তিন কিলো আলু দুকিলো চিনির ব্যাগ আর অন্য হাতে সবজি বোঝাই ভার থাকা অবস্থায় বৃষ্টি না নামলে আজও বৃষ্টিটা খারাপ লাগে না। আর রাতে হলে তো কথাই নেই। যার কোনো কাজ নেই কোথাও যাবার নেই তার জন্য রাতেরবেলা বৃষ্টির শব্দের থেকে বড়ো গানওয়ালা আর কেই বা হতে পারে।

রাইকমল বলে একটি অসাধারন সিনেমা দেখেছিলাম। দেখেছিলাম বলা উচিত নয় আজও দেখি। গল্পটি নাকি তারাশঙ্করের লেখা। মোদ্দা গল্পটি এক চিরন্তন বাঙালি কোনফুশন নিয়ে। উত্তম কুমার বড় না নবদ্বীপ অধীশ্বর সোনার গৌর। এক সুন্দরী বালিকা এই দ্বিধায় হারিয়ে গিয়ে এক ঝড়ের রাতে উদ্ভট দর্শন “বক” বাবাজির পা মুছতে মুছতে গান গাইছে “এ ঘোর রজনী মেঘেরও ঘটা কেমনে যাইব বাঁটে। আঙিনার মাঝে বঁধুয়া ভিজিছে দেখিয়া পরান ও ফাটে।”

হঠাৎ মনে হলো ইস যদি এমন হত। রাই কমলের করুন গানের উত্তরে বক বাবাজি হঠাৎ গেয়ে উঠত – যতই ভাবিস তুই আমায় বোকা ভোলা…একদিন হবি তুই আমার কোকা কোলা। কি ভালই না হত ! কোনো ঘুর প্যাঁচ নেই একদম সিধা সাধা গল্পো। নায়িকা কনফিউজড, নায়ক একেবারে স্পষ্ট। একটা নাচ । বর্ষণ স্নাত নায়িকার সমর্পণ। এবং নায়কের ব্যঞ্জনাময় কোকা কোলা রূপ সুধা পান। ব্যাস শেষ। এত সহজ উপায় থাকতে কেন যে আবহর দিকে এত নজর কে জানে।

কবি ঠাকুর রবি ঠাকুর বলেছেন “সহজ কথা যায় না বলা সহজে”। ছশো মেগা বাইট লেখা ধরে তিনি সহজ কথা সহজ ভাবে বোঝানোর নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে গে লেন এবং উপলব্ধি করলেন — সহজ কথা যায়না বলা সহজে। কিন্তু ঊষা উত্থপ যে গান গেয়েছিল । ছোট বেলা দুর্গা পুজোর প্যান্ডেল কাঁপিয়ে যে অসাধারণ প্রেম নিবেদন শুনেছিলাম। “প্রেম জেগেছে আমার মনে বলছি আমি তাই …তোমায় আমি ভালো বাসি তোমায় আমি চাই।… So simple। একেবারে “তোমার আমার এই যে মিলন। নিতান্তই এ সোজাসুজি।” পূর্বরাগ, প্রেম, বিরহ, মিলন কোনো পর্যায় ভাগের কোনো গল্পো নেই। একেবারে সোজা সুজি মিলন। এবং সেই মিলন এত তাড়াতাড়ি হয়ে গেলো। যে তারপর “উরি ..উরি বাবা…” ছাড়া আর কোনো শব্দ খুঁজেই পাননি এই সহজ কথার গানের কবি।

ব্যোমকে কথাটার মানে কি ? চলন্তিকাতে নেই। বাংলা ভাষা মৃত নয়। নিত্য নতুন কথাকে নিত্য নতুন শব্দ কে ধারণ করে নিয়েই ভাষাকে চলতে হয়। তবেই নাকি ভাষা জীবিত থাকে। ছোটবেলা সংস্কৃত ভাষা কেন মৃত সেটা বোঝানোর জন্যে এই জাতীয় একটা ডেফিনিশন বোঝানো হয়ে ছিল। সেইদিক দিয়ে ভাবতে গেলে বাংলা ভাষাকে জীবিত থাকবার জন্যে এই ব্যোমকে শব্দটাকে অন্তর্গত করতে হয়। হুঁ হুঁ বাবা বেঁচে থাকবার জ্বালা কি কম! তবে নতুন কথা, নতুন শব্দ অনেক সময় আমাদের কবি সাহিত্যিকেরা চালু করে থাকেন। আবার চলতি চলন্তিকা বর্জিত কথা কোনো কবিতা বা গানে জায়গা পেয়ে ভাষার মধ্যে তার স্থান পাকা করে নেয়। এই ব্যোমকে কথাটাও ঠিক সেইরকম। এটাও একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদের গানেই প্রথম স্থান পেয়েছিল। ….দাদু গেলো ব্যোমকে, মাথা গেলো চমকে – কি দেখে হায়। খোকা বাবু যায়। লাল জুতো পায়…বড় বড় দিদিরা সব উঁকি মেরে চায়…২০০৬ সাল । দাদু তখনও বেঁচে…”লাল” জুতো পায় দাদুর খোকা বাংলায় শিল্পের ধ্বজা উড়িয়ে এগিয়ে চলেছে…সেই দেখে দিদির উঁকি মারা ছাড়া আর কিই বা করার থাকে। আর এই বিদ্রোহী কবির, খোকার এই অভূতপূর্ব সাফল্য দেখে দাদুর মাথার অবস্থা বোঝাতে নতুন শব্দ আমদানি করতে হলো। এই একটি শব্দ বৈচিত্রে কবি প্রতিবাদের একটি রূপক গান সৃষ্টি করলেন । কবি নজরুল ইসলামের মতো “লাথি মার, ভাঙ্গরে তালা” র মতন সোজা সহজ কথায় বিপ্লবের পরিবেশ সৃষ্টি তিনি করতে চাননি। সহজ কথা তিনি সহজে বলতে পারলেন না এবং এই অদ্ভুত রূপকের সাহায্যে নেবার ফলে এই অখ্যাত বিদ্রোহী কবির প্রতিবাদ সেই সময় কেউই বুঝতে পারল না যতদিন না খোকাবাবুর রাজ্যপাট চলে যাবার পর তিনি আবার খোকাবাবু কে নিয়ে কলম ধরলেন এবং লিখলেন – “গভীর জলের ফিস আমি গভীর জলের ফিস… পাবলিক তাই নামরেখেছে খোকা চারশ বিস।” – এবং ফিসের সঙ্গে বিসের এই অভূতপূর্ব অন্তমিল করে তিনি অবশেষে খোকাকে মুক্তি দিলেন এবং জনগণের তার প্রতিবাদের ভাষা বুঝে তাকে ধন্য ধন্য করল।

And how many deaths will it take ’till he knows
That too many people have died? – অনুবাদ করে হলো “কত হাজার মরলে পরে মানবে তুমি শেষে বড্ড বেশি মানুষ গেছে বানের জলে ভেসে।” আসল গানে একেবারেই বানের জলের উল্লেখ নেই। কিন্তু কবি সুমন এমন ভাবে শব্দ চয়ন করলেন যে সম্পূর্ণ বিজাতীয় একটা গান আমাদের গ্রাম বাংলার সঙ্গে মিশে গেলো। অনুবাদ করা খুব কঠিন। কোনো এক বড় লেখক বলেছিলেন “Translation is like women. If it is beautiful it is not faithful and if it is faithful it is not beautiful.” বহু কাল আগে হেইসেনবারগ জার্মান ভাষায় বলেছিলেন- “the more precisely the position of some particle is determined, the less precisely its momentum can be known, and vice versa” । এটি হলো uncertainty principle। যার মদ্যা অর্থ হলো যা দেখছি সবই মায়া। অধুনা বঙ্গদেশিয় গিতিকারেরা হেইসেনবারগকে নিয়ে পড়েছেন। সত্যি কোয়ান্টাম ফিজিক্সের সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান বড়ই কম। তাই সঙ্গীতের মাধ্যমে হেইসেনবারগএর লেখা বিভিন্ন কনসেপ্ট আমাদের অনুবাদ করে শোনাচ্ছেন অনেকেই। এই যেমন “বাসন মাজার শব্দ- করছে তোমায় জব্দ- নাম নিয়েছ ছদ্ম- তাই কলমে আবদ্ধ।–কিংবা “তোমাকে জানিনা প্রিয়, জানো না তুমি আমায়, শীতের বেড়াল খেলে ঘাসের ছায়ায় ।” হ্যাঁ। অনুবাদ গুলি হয়ত অক্ষরিক হয় নি। কিন্তু ওই , আগেই বলেছিলাম না। If it is beautiful it is not faithful। শাপমোচন নাটকে রানী তার আঁধার রাতের রাজাকে স্বচক্ষে দেখতে চাইলেন। রাজা বললেন, “কাল চৈত্র সংক্রান্তি। নাগকেশরের বনে নিভৃতে সখাদের সঙ্গে আমার নৃত্যের দিন। প্রাসাদশিখর থেকে দেখো চেয়ে।” রানী বললেন, “চিনব কী করে।” রাজা বললেন “যেমন খুশি কল্পনা করে নিয়ো। সেই কল্পনাই হবে সত্য।” বাসন মাজার শব্দ – কল্পনা করলাম। করছে তোমায় জব্দ — কল্পনা করলাম। নাম নিয়েছ ছদ্ম – কল্পনা করলাম। তাই কলমে আবদ্ধ -কল্পনা করলাম। কল্পনা করলাম। আরও কল্পনা করলাম। আরও, আরও। সত্যিই তো। তার পরেই তো “জ্বলে উঠলো আলো” । আলো তরঙ্গ না কণা। আমরা কেউ কি জানি?